আইনের প্রাথমিক বিষয়গুলো আপনার অবশ্যই জানা উচিত !!!
ভিজিট করতে ক্লিক করুন!
ভিজিট করতে ক্লিক করুন!

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট ॥
আইন পেশায় চার দশক পূর্ণ হয়েছে। এই পেশায় আসার আগে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলাম। সিনিয়র সাংবাদিকরা সকলেই আমার বন্ধু। আইনজীবী হওয়ার পরও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আইনী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হত। সে কারণে সাংবাদিকদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতা বেশী। কোন সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জ্ঞাতসারে কোন মামলা করি না, আমার সাহায্য চাইলে সাংবাদিকদের পক্ষেই করি। দীর্ঘ দিন সাধারণ মানুষের সাথে আমার একটা বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকার কারণে কোন অসুবিধা হলে অনেকে পরামর্শের জন্য আমার কাছে আসেন। কয়েকদিন আগে খুরুস্কুলের অনেক সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারের পরিচিত লোকজন ভীতসন্ত্রস্থ ও উদ্বিগ্ন হয়ে পবিত্র রমজান মাসে আমার সাথে দেখা করেন। একটি অখ্যাত অনলাইন পত্রিকায় খুরুস্কুলে ইয়াবার জোয়ার ধরনের শিরোনাম দিয়ে নাম,পিতার নাম,ঠিকানা দিয়ে খুরুস্কুল ইউনিয়নের প্রায় সকল পাড়ার পূর্ব থেকেই সচ্ছল পরিবারের সম্মানি লোকদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। ’রাজাকার’ ’যুদ্ধাপরাধ’ শব্দ যেমন এখন গালি হিসেবে ব্যবহার হয় ইয়াবা ব্যবসায়ীও মারাত্মক অসম্মানজনক গালি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তারা আমাকে দিয়ে মামলা করাতে চান। আমি এখনও প্রতি সপ্তাহে রবিবারে দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় অতিথি কলাম লিখে থাকি। দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া প্রতিবেদনটি পড়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। এই অপরাধের শাস্তি কমপক্ষে সাত বছর,অনধিক চৌদ্দ বছর কারাদন্ড ও অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদন্ড। অপরাধ অজামিনযোগ্য ও কেবলমাত্র ঢাকায় অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচারযোগ্য। গ্রেপ্তার হলে কক্সবাজারের কোন ম্যাজিষ্ট্রেট বা দায়রা জজ আদালতের জামিন দেওয়ার এখতিয়ার নেই। বিচার শুরু হওয়ার আগেই অনেক দিন হাজতবাস করতে হয়। আমি তাদেরকে মিথ্যা প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দিতে পরামর্শ দিয়েছি।  ইয়াবা ডন ভুট্টো পরিবারের ৩১ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক শিরোনামে সচিত্র সংবাদ প্রচার হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবা কারবারীর তালিকায় দুই নম্বরে থাকা সাইফুল করিম নিহত হওয়ায় তালিকাভুক্ত ইয়াবা ডনরা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ইত্যাদি খবর এবং প্রতি দিন বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। পালিয়ে থাকা ইয়াবা ডনরা কতিপয় সাংবাদিককে অবৈধভাবে বশে নিয়ে প্রশাসন,সরকার ও জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর কৌশল হিসেবে খুরুস্কুলে ইয়াবা জোয়ারের মিথ্যা,কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বা ক্রশফায়ারে হত্যার হুমকীতে গোপন চাঁদাবাজি করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার বাহিরে অনলাইন পত্রিকাটি নিজস্ব তালিকা প্রকাশ করেছে।


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে হবে।(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্য হয়, তবে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হবে। এই অনুচ্ছেদে আমরা পেলাম সংবিধানই হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা,বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে বা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে–(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ সাংবাদিকদের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে কিছু শর্তসাপেক্ষে। শর্তগুলো হল, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকীর মূখে পড়ে বা বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট হয় এমন সংবাদ সত্য হলেও ছাপা যাবে না। জনশৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে এমন সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। শালীনতা ও নৈতিকতা বিরোধী সংবাদ প্রচার করা যাবে না। আদালত অবমাননাকর সংবাদ প্রচার করা যাবে না। ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইনে আদালত অবমাননার স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় ২০১৩ সালে নতুন আদালত অবমাননা আইন তৈরী করে সংসদে পাশ করা হয় যা একটি মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাতিল করে দিয়েছেন। তারপরও আদালত অবমাননাকর কিছু করা এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যে সংবাদে জনসমক্ষে আদালতের মান মর্যাদা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে সে ধরনের সংবাদ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করা উচিৎ নয় বা করা যাবে না। অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা দিতে পারে সে ধরনের স্পর্শকাতর সংবাদ প্রচার করা যাবে না।  কোন ব্যক্তির মানহানিকর সংবাদ প্রচার করা যাবে না। সাংবাদিকবৃন্দ প্রায়ই যে ফৌজদারী মামলায় আসামী হন তা হল মানহানির মামলা। মানহানি কি? কিসে মানহানি হয় এবং কিসে হয় না তা দন্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় উল্লেখ আছে। যদি কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তির খ্যাতি বা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা তার খ্যাতি বা সুনাম নষ্ট হবে বলে জানা সত্ত্বেও বা তা বিশ্বাস করার কারণ থাকা সত্ত্ওে উচ্চারিত বা পঠিত হওয়ার উদ্দেশ্যে কথা দ্বারা বা চিহৃ দ্বারা বা দৃশ্যমান বস্তু বা প্রতীক দ্বারা সেই ব্যক্তি সম্পর্কিত কোন ঘটনার আরোপ করে  বা প্রকাশ করে তা হলে সেই ব্যক্তি উক্ত অপর ব্যক্তির মানহানি করেছে বলে গণ্য করা হবে। এই ধারায় চারটি ব্যাখ্যা, পনেরটি উদাহরণ ও দশটি ব্যতিক্রম আছে। মানহানির অপরাধের জন্য প্রকাশনা অপরিহার্য। যেখানে প্রকাশনা নাই সেখানে মানহানি নাই। আপন মনে নিন্দা করিলে তাতে কোন দোষ হয় না। এমনকি নিন্দাসূচক কিছু লিখলেও তা অপরাধ হবে না যদি না তা প্রকাশিত হয়। নিন্দামূলক কিছু লিখে নিজের কাছে রেখে দিলে তা অপরাধ হবে না। যার সম্পর্কে লেখা হয়েছে তার কাছে প্রেরণ করলেও মানহানির অপরাধ হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না তা কোন তৃতীয় ব্যক্তি বা জনসাধারণের চোখে নিন্দাবাদের কারণে হেয়প্রতিপন্ন না হন ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কথা বা লিপি মানহানি বলে গণ্য হবে না।
 যদি কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির মানহানি করে তবে দন্ডবিধির ৫০০ ধারার বিধান অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিকে দুই বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের জন্য বিনাশ্রম কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা যাবে। যদি কোন ব্যক্তি এমন কোন বস্তু মুদ্রণ করে বা খোদাই করে, যে বস্তু অপর কোন ব্যক্তির পক্ষে মানহানিকর বলে সে জানে বা সেরূপ বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে, তবে সে ব্যক্তিকে দন্ডবিধির ৫০১ ধারা অনুযায়ী দুই বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের জন্য বিনাশ্রম কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা যাবে। যদি কোন ব্যক্তি মুদ্রিত বা খোদাইকৃত এমন মানহানিকর বস্তুবিশিষ্ট কোন দ্রব্য বিক্রয় করে বা বিক্রয় করার জন্য উপস্থাপন করে, তবে সে ব্যক্তি দোষী সাব্যস্থ হলে দন্ডবিধির ৫০২ ধারা অনুযায়ী দুই বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের জন্য বিনাশ্রম কারাদন্ডে বা অর্থ দন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। উল্লেখিত আইনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মহামান্য সুপ্রীমকোটের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন সময় একাধিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যা দেশের বিভিন্ন আইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। সে সিদ্ধান্তগুলোও জজকর্তৃক তৈরী আইন ( ঔঁফমব সধফব ষধ)ি হিসেবে নি¤œ আদালতসহ সবার উপর বাইন্ডিং বা বাধ্যতামূলকভাবে মান্য।  ফৌজদারী আদালতে মানহানির মামলা দায়ের করতে হলে আগে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে প্রকাশিত সংবাদকে সত্য নয় দাবী করে প্রতিবাদ করে তা ছাপানোর জন্য প্রত্রিকার সম্পাদকের বরাবরে প্রতিবাদলিপি প্রেরণ করতে হবে।
সংশোধনীর আগে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী মানহানির মামলায় প্রথম দিনেই ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব ইচ্ছা করলে অভিযুক্ত আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ইস্যু করতে পারতেন। কিন্তু ২০১১ সালে ১নং আইন দ্বারা ফৌজদারী কার্যবিধির তপশীল সংশোধিত হওয়ার পর এখন প্রথমে ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আসামীর প্রতি সমন ইস্যু করতে পারবেন, গ্রেপ্তারী পরোয়ানা নয়।
স্মরণ রাখতে হবে মানহানির মামলায় আসামীর হাজতে যাওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা হলে হাজতে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
আমার হাতে কলম আছে,লেখার স্বাধীনতা আছে বলে কি মিথ্যা,ভিত্তিহীন,কাল্পনিক যা ইচ্ছা তা লিখব? যাদের নাম,পিতার নাম প্রকাশ করছি নিরীহ নির্দোষ সে লোকগুলোর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে তা চিন্তা করতে হবে না? লেখায় দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে না?

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Please To Write An Article Sign-Up
error0
News Reporter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *