পহেলা মে’তে কষ্টের রং !!!
ভিজিট করতে ক্লিক করুন!
ভিজিট করতে ক্লিক করুন!

সেলিব্রেটি হবার ওই একটাই সুবিধা কারণ তাদের সামান্য হাসি কান্নায় হাজার হাজার লাইক ইমো নয়তো কান্না ইমো পড়তে থাকে, পহেলা মে’তে আমাদের মতো ননসেলিব্রেটিদের কষ্টের রং ফ্যাকাসে। সেলিব্রেটিদের কখন যে ঝড় আবার কখন যে বৃষ্টি বুঝা দায়, আমাদের হাসি কান্নাতে থাকে ঘটনা, থাকে স্মৃতি, কখনো ঝড় আবার কখনো বৃষ্টি।
কোনদিন ভাবিনি যে একদিন বৃষ্টির রং গুলো স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠবে তবে সেই রংগুলো খুঁজে পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয় ঠিক সাঁইত্রিশটি বছর, এবার ঠিক বলে দিতে পারবো বৃষ্টির রংগুলো দেখতে কেমন, কোন রং কষ্টের, কোন রং আনন্দের, কোন রং কান্নার আবার বৃষ্টি ভেজা গুমরে কান্নার হুহু শব্দ।

ছোটবেলা বয়সটা ঠিক মনে নেই তবে ঝমঝম বৃষ্টির দিনে মা কিছুতেই আমাদের ঘরের বাইরে যেতে দিতেন না, বৃষ্টিতে ভিজলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে, জানালার গ্রিল ধরে বসে থাকলেই দমকা বাতাসের সাথে বৃষ্টির ঝাপ্টা মুখ ভিজিয়ে দিতো আর সেটাই ছিল সেই ছোট্টবেলার এক আনন্দঘন মুহূর্ত।


ডানা ভেজা পাখিগুলো খুব জড়োসড়ো হয়ে সামনের বাড়ির কার্নিশের উপর বসে বসে ঝিমাতো, রাস্তার উপর দিয়ে টুং টাং করে রিক্সা চলে যেতো, প্লাস্টিকের আবরণে ঢাকা যাত্রীটি বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে হুট্ তোলা রিক্সার ভেতর গুটুশুটি হয়ে বসে আছে, ঠিক আজ এতগুলো বছর পর হঠাৎ যেন সেই বৃষ্টির রংটা মনে হয় নীল কষ্টের মতো।

রিক্সা চালকদের কি কখনো বৃষ্টিতে ঠান্ডা লাগতো না? মা তো বলতেন বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগে অথচ সেই বয়সে বুঝতে পারিনি রিক্সা ওয়ালাদের বৃষ্টিতে ঠান্ডা লাগতো না, কারণ তাদের ঠান্ডা লাগলে ঘরের সন্তানদের খাওয়া জুটবে না। মাঝে মাঝে ভাবি রিক্সা ওয়ালারা কি জানতো ১৮৮৬ সালে শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমজীবী মানুষরা আট ঘন্টা কর্ম দিবসের দাবিতে রাস্তায় নেমে ছিল? নাহঃ এটা বাংলাদেশ, এদেশের শ্রমজীবী মানুষের কর্ম দিবস বলে কিছুই থাকে না, পেশীবাজরা ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে দিব্বি সরকার প্রধানের পাশের টেবিলে উপদেষ্টা সেজে বসে থাকেন, আজ এতগুলো বছর পর বুঝতে পারি সেই কষ্ট গাঢ় নীল রঙে আচ্ছাদিত।

মন্ত্রী মশাই ঘোষণা দিয়ে দিলেন জনগণের টাকা থেকে নেয়া ঋণ মৌকুফ হয়ে যাবে, এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কেউ রাস্তায় নামবে না, এখানে মে দিবসে লাল পতাকা ঝুলিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা সাধারণ মানুষের সাথে ঠকবাজি খেলাতে মেতে উঠেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশের ব্যাংকে চলে যায় ঠিক তখনই সরকার মে দিবস পালনে মত্ত হয়।

নানার বাড়ি টিনের চলে বৃষ্টির শব্দে কত যে মধুর স্মৃতি লুকিয়ে আছে, অবিরাম টিনের চলে বৃষ্টির ছন্দময় শব্দের সাথে হঠাৎ ধুপ করে গাছের উপর থেকে আম পরতেই পড়ি কি মরি কে আগে আম কুড়োতে যাবে সেই ধুম, বাড়ির বড়রা শত চেষ্টা করেও সেই আনন্দকে মাটি চাপা দিতে পারতো না, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মধ্যে রাতের দিকে গা একটু গরম হলেই মায়ের বকুনির মাত্রা বেড়ে গিয়ে থার্মোমিটার ভেঙে যাবার উপক্রম।

আজ সাঁইত্রিশটি বছর পর চিটাগাং থেকে ঢাকা যাচ্ছে আমাদের গ্রিন লাইন বাস পথে সেই নানীর বাড়ির মতো ঝুমঝুম বৃষ্টি বাসের জানালার উপর এসে পড়ছে আর আমি স্মৃতির সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছি, অন্ন্যানো যাত্রীরা কেউবা হাতে ডিকেন্স বা শরৎ বাবুর বই ঘাঁটছেন কেউ বা গিন্নির সাথে টেলিফোনে ব্যাংকক যাবার টিকেট কনফার্মেশনর খবরটা পৌঁছে দিচ্ছেন, রাতের বাসে বাতি নেভানো থাকলেও বাসের ভেতরে অনেকগুলো স্মার্ট ফোনের আলোতে পূর্ণিমার মতো আলোকিত হয়ে আছে।

মধ্যে রাতে বাসটা কুমিল্লাতে একটা রেস্তোরার সামনে যাত্রা বিরতিতে থেমে যেতেই বৃষ্টির তেজও খানিকটা কমে এলো।
মধ্যে রাতে ক্ষুদায় জর্জরিত হয়ে গ্রিন লাইনের বুফে রেস্তরাতে ঢুকেই মাথার ভেতর সলিল চৌধুরীর একটি গান বার বার বেজে উঠছে “অধিকার কে কাকে দেয় ,,,, অধিকার কেড়ে নিতে হয়”।

আট থেকে বারো বছরের শিশুগুলো খুব ব্যস্ততার সাথে যাত্রীদের
আপ্যায়ন করতে হিমশিম খাচ্ছে, ক্যাশ বাক্স নিয়ে মোটা এক মধ্যে বয়সী লোক শিশু গুলোকে বকাঝকা দিয়ে যাত্রীদের সেবায় মনোযোগ আকর্ষণ করাচ্ছে। মুহূর্তের মাঝেই ঠিক সাঁইত্রিশ বছর আগে এ রকম বয়সে আমিও নানীর বাড়িতে ঠিক এ রকম একটি বৃষ্টি মুখুর রাতে আম কুড়াবার ধূমে মেতে ছিলাম, বুকের মাঝে একটা ব্যথা অনুভব করতে বুঝতে পারলাম এ এক কঠিন কষ্ট যার রং শুধুই কালো এই রং যেন কখনোই ফ্যাকাশে হবে না.

কোনদিনই কি এই শিশুদের নানীর বাড়ির টিনের চলে ধুপ ধাপ করে আমি পড়ে না ? আমার গলা দিয়ে গ্রিন লাইন বুফের এক চিমটি খাবারও গলা দিয়ে নামছে না, সেই দিন আমার ক্ষুদাও যেন বুঝতে পেরেছিলো কষ্টের রং কখনো পাল্টায় না। আর এখানেই ভদ্রবেশী সুশীল যাত্ৰী বাবুরা একজন বুঝতে পারলো না মধ্যম আয়ের দেশে শিশু শ্রম কতটা দৃষ্টিকটু।

হঠাৎ আমার পকেটের স্মার্ট ফোনটা বেজে উঠলো সুদর সুইডেন থেকে আমার ছোট্ট মেয়েটি প্রশ্ন করছে -“বাবা তুমি এখন কোথায় কি করছো ?” আমি আমার মেয়ে কে উত্তর দিলাম -মামনি, এখন আমাদের দেশে বৃষ্টি হচ্ছে আর এই বৃষ্টির রং কালো,
আমার মেয়েটি বললো “বাবা তুমি বোধহয় জার্নি করতে করতে খুব দুর্বল হয়ে গেছো, ঢাকাতে পৌঁছে লম্ব্বা একটা ঘুম দিলেই বুঝবে আনন্দের রং হয় সোনালী।”

—মাহবুব আরিফ

লেখক ও সমালোচক

Please To Write An Article Sign-Up
error0
News Reporter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *