বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প
ভিজিট করতে ক্লিক করুন!
ভিজিট করতে ক্লিক করুন!

সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চারটি প্রধান ধর্মে (হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান) বিভক্ত। সকল ধর্মের অনুসারীগনই নিজ নিজ দৃষ্টিকোন থেকে একজনকে সৃষ্টিকর্তা বলে মানেন এবং জানেন। একে আমি বলি ধর্মবিশ্বাস অথবা আস্তিকতা।
এখন আসি ধর্ম প্রসঙ্গে। ধর্ম আসলে কি? আমার মতে ধর্ম হলো একটি অবলম্বন অথবা সুকাঠামো যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ তার প্রবাহমান জীবনকে সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত রাখতে পারেন। আর ধর্মীয় কৃষ্টি কালচার হলো মানুষের জীবনকে সুপথে নিয়ন্ত্রিত রাখার কিছু পন্থা। আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্য ধর্মীয় কৃষ্টি কালচার পালন করে থাকি।
তবে বিভক্ত এই চার ধর্মের মানুষের মাঝেই আবহমান কাল ধরে চলে আসছে ধর্মীয় ভেদাভেদ। প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ দৃষ্টিকোন থেকে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত ; বাকিসব ধর্ম মিথ্যা। এভাবে একসময় মানুষ অন্যধর্মের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মানুষ কখনো হিংস্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেনা; ক্রমাগত হিংস্র হয়ে ওঠে। এর জন্য দায়ী তার সমাজ ব্যবস্থা, অশিক্ষা – কুশিক্ষা, অজ্ঞতা – অন্ধকারাচ্ছন্নতা। এরমধ্যে অন্যতম একটি হলো ধর্মান্ধতা। ধর্মান্ধতা থেকে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িকতা আর সাম্প্রদায়িকতা থেকে জন্ম নেয় উগ্রবাদ। আর উগ্রবাদ সবসময়ই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। সমগ্র বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিগ্রহের একটি অন্যতম প্রধান কারণ এই ধর্মীয় ভেদাভেদ। যেভাবে ধর্মীয় দাঙ্গামা শুরু হয়েছে, আতঙ্কে ভুগছি হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে শুধু উগ্রবাদী আর ধর্মান্ধদের কারণে যার ভয়াবহতা হবে হয়তো পূর্বেকার চাইতে কয়েকগুণ বেশি। মানবতা থেকে প্রাধান্য পাবে নিজ নিজ ধর্মীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার। তবে এত্থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আছে?

সাম্প্রদায়িকতার কারণেই সেই ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে নৃশংস বোমা হামলা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ২০১৮ এর ২৩ জুলাই বাংলাদেশের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বে আলোড়িত। একমাত্র এই সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ২০১৯ এর ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ড ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে নামাজীদের ওপর হামলা হয়। সেই শোকের রেষ কাটতে না কাটতেই আবার শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোসহ দেশটির অন্তত ছয়টি স্থানে তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও সাম্প্রদায়িকতার রোষানলে সমগ্র বিশ্বের সংখ্যালঘুরাই নিজ নিজ দেশে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। সিরিয়া, ফিলিস্তান, ইসরাইল এবং ভারতের কিছু কিছু জায়গায় মুসলিম নির্যাতিত হচ্ছে।

সমগ্র পৃথিবীতে শুধু চারটি প্রধান ধর্মই নয়; এর রয়েছে আবার কতো শাখা প্রশাখা। যেমন মুসলিম ধর্মে আছে কেউ শিয়া, আবার কেউ সুন্নি। সুন্নিদের মধ্যে আবার কেউ শরিয়তি, কেউ মারফতি। এই তো সেদিনের ঘটনা — ২০১৯ এর ১১ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা শহরে মায়ের সামনেই ছয় বছরের শিশু কন্যাকে গলা কেটে হত্যা করেছে তাদের বহনকারী ট্যাক্সির চালক। শিশু কন্যাটির মায়ের মুখে দুরুদ শরিফ শোনার পর শিয়া মুসলিম বুঝতে পেরে গাড়ির কাঁচ ভেঙে তা দিয়েই হত্যা করে শিশুটিকে। যারা নিজ ধর্মের মধ্যেই জাত ভেদাভেদ ভুলতে পারেনা তারা কি করে অন্যের ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে?
হিন্দু ধর্মে রয়েছে আবার উচু নীচু জাত ভেদাভেদ। সেখানে নীচু জাতেরা উচু জাত কর্তৃক সমাজে চরমভাবে নিগৃহীত। এই ২০১৯ এর ১৯ জানুয়ারি ভারতের উড়িষ্যায় নীচু জাতের হওয়াতে মায়ের মৃতদেহ সৎকারে কারো সাহায্য পায়নি সরোজ নামে ১৭ বছরের এক কিশোর। অনন্যোপায় হয়ে মায়ের মৃতদেহকে সাইকেলে বেঁধে ৪-৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্মশানে দাহ করার সুযোগও হয়নি। নির্মম ও নিষ্ঠুর জাতিভেদের শিকার হয়ে দূরের জংগলে মাকে সমাহিত করতে হয়েছে। এঘটনা শুনে আমি অঝোরে কেঁদেছিলাম। লিখতে গিয়ে আজও কাদঁছি। এমন ঘটনা নিরবে নিভৃতে হাজারো ঘটছে। মানবতা যেন মাথা ঠুকরে কাঁদছে। বুঝিনা যেই ধর্ম জাত ভেদাভেদে মানুষের মানবতাকে ভুলিয়ে দেয় সেই ধর্ম কি করে ‘ধর্ম’ হয়? “এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান গোত্র নাহি রবে”_লালন ফকির। এমন পাশবিকতা দেখার পরে সত্যিই মনে হয় আমি লালন সাঁই জি’র মতো জাতি ধর্ম গোত্রহীন একজন মানুষে পরিণত হই যেখানে থাকবে শুধুই মানবতা। আসলেই তো তা-ই, যা কিছু সত্য ও সুন্দর তা-ই ধর্ম। ধর্ম হলো মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ; মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ। মানবতার ঊর্ধ্বে কোনোই ধর্ম হতে পারেনা।

“আগুন, পানি, বাতাস, মাটি এবং শুন্য সম্বলিত প্রকৃতির সমস্ত ফিজিক্স কেমিস্ট্রির নিয়ম ও আচরণই হচ্ছে ধর্ম”__ স্যার পান্না চৌধুরী। তেমনি মানুষেরও সত্তাগত একটি ধর্ম আছে -‘মনুষ্যত্ব’। বাকিসব (সম্প্রদায়ভুক্ত সকল ধর্ম) মনুষ্য সৃষ্টই কেবল। কারো থাকতেই পারে একটি সুন্দর অনুসরণীয় পথ, মত এবং বিশ্বাস যাকে তিনি ধর্ম বলেই জানেন মানেন। তবে সেই বিশ্বাস জোরপূর্বক অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টাকেই বলে ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদীতা। মানুষের প্রকৃত ধর্ম তো কেবল অন্তরেই থাকে। ধর্মীয় রিচুয়্যাল অ্যাক্টিভিটিস; যা অন্যকে দেখানো যায় অর্থাৎ ধর্মীয় লেবাস অথবা বহিরাঙ্গে সাধুসাজ কখনো ধর্ম হতে পারেনা।
ভেদাভেদ যেখানে আছে, বিরোধ বা লড়াই সেখানে অনিবার্য। ধর্মীয় ভেদাভেদ যদি মানুষকে সাম্প্রদায়িকতায় কেন্দ্রীভূত করে তবে আমি কোনো ক্যাটাগরিতে পরতে চাইনা; আমি সার্বজনীন হতে চাই। চিৎকার করে বলতে চাই, ” আমি না হিন্দু, না মুসলিম, না বৌদ্ধ, না খ্রিস্টান ; আমি শুধু একজন মানুষ… শুধুই মানুষ। আমার স্রষ্টাকে আমি মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, অন্ধকার গুহা, ধু ধু মরুভূমি, পানি, বায়ু, অগ্নি, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই উপলব্ধি করি। পৃথিবীর সকল মনুষ্যজাতি, পশুপাখি থেকে শুরু করে যদি সবকিছুই একই স্রষ্টার সৃষ্টি হয় তবে কেবল আমরা মনুষ্যজাতিই কেন ধর্মকে আলাদা আলাদা ভাগে বিভক্ত করেছি? পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীর তো আলাদা আলাদা কোনো ধর্ম নেই। ওদের ধর্ম বলতে শুধু ওদের স্বকীয় সত্তাকেই বোঝায়। তবে কি ওদের মৃত্যুর পরে স্বর্গপ্রাপ্তি অথবা জান্নাতপ্রাপ্তি হবেনা? নাকি আমরা মনুষ্যজাতিই কেবল স্বর্গ/বেহেস্ত নিয়ে কাড়াকাড়ি করছি?
সম্প্রদায় প্রীতি, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা, নিন্দা সমালোচনা এটা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলে মনে হয়। এত্থেকে ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষের কঠিন। তবে মহৎ গুনের মানুষও পৃথিবীতে আছে। যারা নিজ নিজ ধর্মে অধিভুক্ত থেকেও মানবতার ঊর্ধ্বে তাদেরকে অন্তর থেকে প্রণিপাত জানাই।
সমগ্র বিশ্ব যখন সাম্প্রদায়িকতায় জর্জরিত তখন অসাম্প্রদায়িকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কানাডায় টরন্টোস্থ ট্রিনিটি সেন্ট পলস ইউনাইটেড চার্চে নামাজের জন্য আহবান জানিয়ে খুলে দেয়া হয়েছে গীর্জার দরজা। কিছুদিন পূর্বে ভারতের কেরেলা রাজ্যে ঈদগাহ বন্যার পানিতে ডুবে গেলে মন্দিরের দরজা খুলে দেয়া হয় নামাজীদের নামাজের জন্য। তেমনি মুসলিমদের মধ্যেও মহৎ হৃদয়ের কিছু মানুষ না থাকলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে যেত। “মুসলিম মানেই উগ্রবাদী”, এই দৃষ্টিভঙ্গিও ভয়ংকর রকমের বর্ণবাদীতা। বেপরোয়া ধর্মান্ধদেরকেই জঙ্গি বলা হয়; তা যে ধর্মেরই হোকনা কেন। কারো হিংস্রতা প্রকাশ্যে; কারো বা থাকে অন্তরে। সুযোগ পেলেই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে।

মোঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র আওরঙ্গজেব যখন পিতাকে বন্দী করে জোরপূর্বক মোঘল সম্রাজ্য দখল করেন তখন সকল ধর্মে সম্প্রীতি থাকার অপরাধে সহোদর ভাই দারাকে মৃত্যুদন্ড দেন ধর্মপ্রাণ সুন্নি মুসলমান আওরঙ্গজেব। ধর্মকে পূঁজি করে একে একে মসনদের (সিংহাসন) দাবিদার সকল ভাইকে মৃত্যুদন্ড দেন। তখন তার উক্তিতে, ” ইসলামের স্বার্থে কারো প্রাণ নিলে তাকে হত্যা বলেনা; কোরবানি বলা হয়”। বৃদ্ধ বয়সে যখন তিনি নিজ পিতার মতোই পুত্রের হাতে বন্দিজীবন কাটাচ্ছিলেন তখন নিজ হাতে ভাইয়েদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া এবং পিতাকে বন্দির অপরাধবোধে সারাক্ষণ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতেন। পৃথিবীতেই তার কৃতকর্মের সকল শাস্তি পেয়ে গেছেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বীকার করেছেন “পবিত্র কুরআন বুকে ধারণ করেও যদি কেউ হৃদয়হীন হয় তাহলে তার নিস্তার নেই। ইসলাম মানুষকে উদারতা শেখায়। ইসলামের উদারতা যে ধারন করতে না পারে, সে প্রকৃত মুসলমান নয়। এদেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সকলের সম্প্রীতিতে গাঁথা।”
সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই। আমাদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার পথে প্রধান বাধা ধর্মীয় ভেদাভেদ যা জন্মের পর থেকেই প্রত্যেকের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত করার উপায় হিসেবে মানুষকে বেশি বেশি সংস্কৃতি চর্চায় উদ্ভুদ্ধ করা এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্ত চিন্তাচেতনার কিছু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংযোজন করা অতীব প্রয়োজন। মানুষ চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত হোক এই হোক প্রত্যয়।

লেখক মুক্তা অভিমুক্তি।

Please To Write An Article Sign-Up
error0
News Reporter

1 thought on “বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প

  1. অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কথা উপস্থাপন করেছেন আমি ধন্যবাদ এজন্য আপনাকে। আমিও চাই আপনার মত আপনার সাথে সহমতে অবস্থান করতে। সমগ্র জাতির মধ্য থেকে ধর্মের ভেদাভেদ তুলে দিয়ে মানবিকতার স্থান দখল করে নিতে চাই।যেখানে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি ভেদ নাহি রবে মানবতার সর্বোচ্চ শিখর উঠে আমরা পৃথিবী স্বর্গের রূপান্তর করতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *